প্রতিনিধি ৪ অক্টোবর ২০২৬ , ১১:১৮:০৬ প্রিন্ট সংস্করণ
এম শাহাদাত ॥
বরিশাল থেকে বিদায়ের প্রহরে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন বরিশাল সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আজহারুল ইসলাম। দীর্ঘ ২ বছর ১ মাস ১৩ দিনের দায়িত্ব পালন শেষে প্রিয় কর্মস্থল, সহকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী এবং বরিশালের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন তিনি।

দায়িত্বের শেষ সপ্তাহের প্রহরে দাঁড়িয়ে আজহারুল ইসলাম যেন ফিরে দেখেছেন বরিশালে কাটানো দীর্ঘ সময়ের স্মৃতিগুলো। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এই সময়ে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক, মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ এবং অসংখ্য ভালো মানুষের সাহচর্যকে জীবনের বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন তিনি।
বিদায়ী বার্তায় তিনি জানান, এসিল্যান্ড হিসেবে তার প্রথম কর্মস্থল ছিল মুলাদী। সেখানে চার মাস দায়িত্ব পালনের পর তৎকালীন কমিশনার শওকত আলীর সিদ্ধান্তে বরিশাল সদরে দায়িত্ব পান তিনি। অথচ সদর উপজেলার মতো ব্যস্ত ও কর্মচঞ্চল এলাকায় পোস্টিং হওয়ার খবর শুনে প্রথমদিকে তার মন খারাপই হয়েছিল। কাজের চাপ কম এমন কোনো উপজেলায় নীরবে-নিভৃতে সময় কাটানোর ইচ্ছা ছিল তার।
কিন্তু বরিশাল সদরে যোগদানের পর বদলে যায় সেই ভাবনা।
বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ, মানুষের ভালোবাসা, সহকর্মীদের সহযোগিতা এবং কিছু অসাধারণ মানুষের সাহচর্য ধীরে ধীরে বরিশাল সদরকে তার কাছে করে তোলে সবচেয়ে প্রিয় কর্মস্থল। এমনকি যোগদানের মাত্র তিন মাসের মাথায় ঢাকায় বদলির আদেশ হলেও বরিশালের মানুষের মায়া ছেড়ে যেতে পারেননি তিনি।
দায়িত্ব পালনের স্মৃতি হিসেবে সবচেয়ে বেশি মনে পড়বে কীর্তনখোলা নদীর গভীর রাতের অভিযানগুলো। বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে রাতের আঁধারে নদীতে কাটানো সময়গুলো এখন তার কাছে হয়ে উঠেছে স্মৃতির অংশ।
প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যেমন কঠোর হতে হয়েছে, তেমনি মানুষের নানা অভিযোগ, প্রত্যাশা ও সমস্যার কথাও শুনতে হয়েছে তাকে। নামজারি শুনানি থেকে শুরু করে ভূমিসেবা সংক্রান্ত নানা কাজে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ তার কাছে এসেছেন। কখনো কাজের চাপ কিংবা পরিস্থিতির কারণে কারও সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলে থাকলে তার জন্যও বিদায়ের আগে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি।
তার বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ জায়গাটি হয়তো এখানেই। একজন সরকারি কর্মকর্তার বিদায়বেলায় নিজের কাজের মূল্যায়নের চূড়ান্ত বিচারক হিসেবে তিনি কোনো পদ, ক্ষমতা কিংবা অর্জনকে সামনে আনেননি। বরং সেই বিচারভার ছেড়ে দিয়েছেন বরিশালের মানুষের হাতে।
তিনি বলেছেন, সদর এসিল্যান্ড হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন, সেই মূল্যায়ন এই জনপদের মানুষই করবেন। তবে বিদায়ের মুহূর্তে তার নিজের কাছে যে আত্মবিশ্বাসটুকু রয়েছে, তা হলো তিনি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হতে না পারলেও মানুষের ঘৃণার কারণ হননি।
একজন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তার জন্য এর চেয়ে বড় আত্মতৃপ্তি আর কী হতে পারে?
বরিশালের গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন আজহারুল ইসলাম। দায়িত্ব পালনের সময়ে সাংবাদিকদের কাছ থেকে পাওয়া আন্তরিকতা ও সহযোগিতাকে তিনি অভূতপূর্ব বলে উল্লেখ করেছেন। গণমাধ্যমকর্মীদের অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও জানান তিনি।
বিদায়ের এই সময়ে বরিশালের মানুষের আতিথেয়তা ও ভালোবাসাকে জীবনের সুখস্মৃতি হিসেবে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন আজহারুল ইসলাম। কর্মস্থল বদল হয়, দায়িত্ব বদল হয়, সরকারি কর্মকর্তার পদায়নও বদলে যায়। কিন্তু কিছু জায়গা মানুষের হৃদয়ে থেকে যায়। কিছু মানুষও তাদের কাজের মাধ্যমে মানুষের স্মৃতিতে জায়গা করে নেন।
বরিশাল সদর থেকে আজহারুল ইসলামের বিদায়ও যেন তেমনই একটি মুহূর্ত।
দীর্ঘ ২ বছর ১ মাস ১৩ দিনের কর্মযাত্রার শেষে তিনি বিদায় নিচ্ছেন একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে। কিন্তু বরিশালের মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক, কীর্তনখোলা নদীর রাতের অভিযান, অফিসের ব্যস্ত দিন, অসংখ্য মানুষের মুখ, সহকর্মীদের সহযোগিতা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগের স্মৃতিগুলো তার সঙ্গে থেকে যাবে।
আর বরিশালের মানুষও হয়তো মনে রাখবে এমন একজন এসিল্যান্ডকে, যিনি বিদায়ের দিন নিজের কৃতিত্বের গল্প না বলে মানুষের কাছে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন এবং ভালোবাসা না পেলেও অন্তত ঘৃণার কারণ না হওয়ার আত্মতৃপ্তি নিয়ে বিদায় নিয়েছেন।
বরিশাল সদর আজ তার কর্মস্থল থেকে বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর আজহারুল ইসলাম নিয়ে যাচ্ছেন এই শহরের মানুষের আতিথেয়তা, ভালোবাসা আর অসংখ্য স্মৃতির এক অদৃশ্য ঝুলি।
বিদায় বরিশাল।
বিদায় নয়, বরং অন্য কোনো কর্মস্থল থেকে আবারও মানুষের জন্য কাজ করার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাওয়া।

















