বরিশাল

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে শায়েস্তাবাদে রাতের আঁধারে তৈরি হচ্ছে হলুদ অটো

  প্রতিনিধি ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১২:২২:৫৬ প্রিন্ট সংস্করণ

‎নুরে আলম॥‎
‎বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের মাস্টার বাড়ি স্কুলের সামনে রাতের আঁধারে নতুন করে ব্যাটারিচালিত হলুদ অটোরিকশা তৈরির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিধিনিষেধ ও অনুমোদনের বিষয়টি উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় গোপনে নতুন হলুদ অটো তৈরি করা হচ্ছে।

 


‎সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাস্টার বাড়ি স্কুলের সামনে পাশাপাশি দুটি দোকানে নতুন হলুদ অটোরিকশা তৈরির কাজ চলছে। সেখানে ৩ থেকে ৪ জন শ্রমিককে রাতের বেলায় অটোরিকশা তৈরিতে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের তুলনায় রাতের বেলায় এসব যানবাহন তৈরির কাজ বেশি করা হয়।

 


‎সরেজমিনে আরও কিছুদূর এগিয়ে একটি মন্দিরের কাছাকাছি আরেকটি গ্যারেজে প্রকাশ্যেই নতুন হলুদ অটোরিকশা তৈরির কাজ চলতে দেখা যায়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই এসব যানবাহন কীভাবে তৈরি হচ্ছে এবং তৈরি করা যানবাহনগুলো পরবর্তীতে কীভাবে সড়কে নামছে।




‎বরিশালে নতুন করে হলুদ অটো নির্মাণ নিয়ে এর আগেও নিষেধাজ্ঞার কথা প্রকাশ্যে এসেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বরিশালে নতুন করে অটো গাড়ি নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বলে মন্তব্য করেছিলেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। একই ঘটনায় একটি ওয়ার্কশপ থেকে চারটি নতুন ব্যাটারিচালিত হলুদ অটোরিকশা জব্দের খবরও প্রকাশিত হয়েছিল।

 


‎এদিকে জুন ২০২৬-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বরিশাল সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী নগরীতে অনুমোদিত হলুদ অটোর সংখ্যা ৭ হাজার ৬১০টি বলে জানানো হয়। একই প্রতিবেদনে ৩০ জুনের পর অনুমোদনহীন হলুদ অটোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

 


‎সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ১৬ ধারায় রেজিস্ট্রেশন সনদ ছাড়া সড়ক, মহাসড়ক বা পাবলিক প্লেসে মোটরযান চালানো বা চালানোর অনুমতি দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। একই ধারায় রেজিস্ট্রেশন নম্বরপ্লেট ছাড়া মোটরযান চালানোর ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে।

 


‎আইনের ৭২ ধারার বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রেজিস্ট্রেশন ছাড়া মোটরযান চালানো বা চালানোর অনুমতি দিলে অনধিক ৬ মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

 


‎এ ছাড়া বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, কোনো মোটরযান নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত কাগজপত্র, প্রস্তুতকারক/বিআরটিএ অনুমোদিত বডি ও আসন বিন্যাসের স্পেসিফিকেশনসহ বিভিন্ন নথি প্রয়োজন হয়।

 


‎নতুন হলুদ অটো তৈরির বিষয়ে অভিযুক্ত মো. জুয়েলের সঙ্গে কথা হয়। এ সময় তিনি বলেন, “আমি সবাইকে ম্যানেজ করেই চলি। পারলে বন্ধ করেন।”

 


‎তার এমন বক্তব্যের পর স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কারা বা কোন পর্যায়ের ব্যক্তিদের ‘ম্যানেজ’ করে এসব যানবাহন তৈরি করা হচ্ছে। তবে জুয়েলের বক্তব্যে ‘ম্যানেজ’ বলতে তিনি কাদের বোঝাচ্ছেন, তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও তদন্ত প্রয়োজন।

 


‎স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে রাতের বেলায় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে একাধিক স্থানে অটোরিকশা তৈরির কাজ চলছে। এসব গ্যারেজে বিদ্যুৎ সংযোগ বৈধ কি না, বাণিজ্যিক কাজে বিদ্যুৎ ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

 


‎স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি নতুন হলুদ অটো নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা বা অনুমোদনের সীমাবদ্ধতা থেকে থাকে, তাহলে শায়েস্তাবাদের এসব গ্যারেজে প্রকাশ্যে কিংবা রাতের আঁধারে কীভাবে নির্মাণকাজ চলছে?

 


‎স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বিষয়টি শুধু একটি-দুটি অটোরিকশা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিতভাবে নতুন যানবাহন তৈরি হয়ে থাকলে তা পরবর্তীতে সড়কে নামার সুযোগ পেতে পারে। এতে বিদ্যমান পরিবহন ব্যবস্থায় অনিয়ম বাড়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনা ও যানজটের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

 


‎তাই শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের মাস্টার বাড়ি স্কুলের সামনে এবং মন্দিরসংলগ্ন গ্যারেজে নতুন হলুদ অটোরিকশা তৈরির অভিযোগ তদন্ত করে দেখা, সংশ্লিষ্ট যানবাহনের কাগজপত্র ও অনুমোদন যাচাই এবং আইন ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

 


‎এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন, বিআরটিএ, পুলিশ এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বিত নজরদারি ও তদন্তের দাবি উঠেছে।

 


‎উল্লেখ্য: আজকের তালাশের অনুসন্ধানী টিম সরেজমিনে গিয়ে নতুন হলুদ অটোরিকশা তৈরির দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনকে অবহিত করতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করা হলে, ৯৯৯ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি কাউনিয়া থানার সঙ্গে সংযোগ করে দেয়। ‎এরপর ঘটনাস্থলে পুলিশ আসার অপেক্ষায় প্রায় এক ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও পুলিশের দেখা মেলেনি। একপর্যায়ে থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়, “আমরা অন্য জায়গায় আছি, এখন আসতে পারবো না।” ‎ফলে প্রকাশ্য স্থানে নতুন হলুদ অটোরিকশা তৈরির বিষয়টি ৯৯৯-এর মাধ্যমে অবহিত করার পরও তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

আরও খবর

Sponsered content