বরিশাল

বরিশাল সমাজসেবায় প্রশ্নবিদ্ধ সেবাব্যবস্থা

  প্রতিনিধি ২৬ অক্টোবর ২০২৬ , ১১:৫৯:৩৫ প্রিন্ট সংস্করণ

মারুফ হোসেন॥
ক্যান্সার, কিডনি রোগ, লিভার সিরোসিস, প্যারালাইসিস, হৃদরোগ, লিউকেমিয়া ও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের আর্থিক সহায়তা কার্যক্রম। এই উদ্যোগ কেবল অর্থ সহায়তা নয়, বরং দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু সেই সহায়তা পেতে যদি অসুস্থ মানুষের স্বজনদের মাসের পর মাস সরকারি দপ্তরের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, আর দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার অভিযোগ ওঠে, তবে প্রশ্ন উঠবেই, সরকারের মানবিক উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাধা কোথায়?

 

 

বরিশাল সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে ওঠা একটি অভিযোগ এই প্রশ্নকে সামনে এনেছে। অভিযোগকারী জানিয়েছেন, তাঁর বাবার লিভার সিরোসিসের চিকিৎসার জন্য সরকারি আর্থিক সহায়তা পেতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হালনাগাদ করে জমা দেওয়ার পরও তাঁকে ছয় মাস ধরে নানা অজুহাতে ঘোরানো হয়েছে। অথচ তাঁর চাচাতো ভাই একই ধরনের সহায়তার জন্য আবেদন করে মাত্র দুই মাসের মধ্যে অর্থ পেয়েছেন বলে তিনি দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এ ক্ষেত্রে দালালদের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং অর্ধেক-অর্ধেক চুক্তিতে অর্থ পাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।

 

 

অভিযোগটি সত্য হলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ, সরকারি সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, হয়রানি কিংবা অবৈধ লেনদেনের সুযোগ থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন অসহায় রোগী ও তাঁদের পরিবার। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে যাঁরা এমনিতেই আর্থিক সংকটে পড়েন, তাঁদের যদি সহায়তা পেতেও বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়, তবে এই কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।

 

 

এখানে আরও কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও একজন আবেদনকারী ছয় মাস অপেক্ষা করবেন কেন? একই ধরনের সহায়তার ক্ষেত্রে আবেদন নিষ্পত্তির সময় এত ভিন্ন হবে কেন? আবেদন যাচাই ও অর্থ ছাড়ের নির্ধারিত নিয়ম কী? আর দালালদের মাধ্যমে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার অভিযোগের ভিত্তি কী?

 

 

সরকারি সহায়তা কোনো ব্যক্তির দয়া নয়, এটি নির্ধারিত নীতিমালা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পাওয়ার কথা। ফলে কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ আছে কি না, তিনি দালালের দ্বারস্থ হয়েছেন কি না কিংবা অতিরিক্ত অর্থ দিতে পেরেছেন কি না, এসব যেন সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাবক হয়ে না দাঁড়ায়। আবেদন গ্রহণ থেকে অর্থ ছাড় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। আবেদনকারীকে তাঁর আবেদনের বর্তমান অবস্থা, বিলম্বের কারণ এবং সম্ভাব্য নিষ্পত্তির সময় জানানোও জরুরি।

 

 

সমাজসেবা অধিদপ্তরের দায়িত্ব শুধু অর্থ বিতরণ নয়, প্রকৃত অসহায় মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। তাই বরিশালের এই অভিযোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে উপেক্ষা না করে কর্তৃপক্ষের উচিত নিরপেক্ষ তদন্ত করা, আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্বের কারণ প্রকাশ করা এবং দালালচক্রের অস্তিত্ব থাকলে তা নির্মূল করা।

 

 

দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত একজন রোগীর কাছে প্রতিটি দিন গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর পরিবারের কাছে ছয় মাসের অপেক্ষা শুধু প্রশাসনিক বিলম্ব নয় তা চিকিৎসা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও মানসিক স্থিতির ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। যে সহায়তা সংকটের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা, সেই সহায়তা পেতে যদি হয়রানি ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়, তবে তা জনসেবার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

 

 

আমরা চাই, বরিশাল সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হোক।

 

 

যোগ্য রোগীরা যেন কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই তাঁদের প্রাপ্য সহায়তা পান। সরকারি সহায়তার অর্থ যেন প্রকৃত অসহায় মানুষের চিকিৎসায় কাজে লাগে, কোনো অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি না করে। মানবিক এই কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হোক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার।

আরও খবর

Sponsered content