প্রতিনিধি ১২ অক্টোবর ২০২৬ , ১২:০১:৪৯ প্রিন্ট সংস্করণ
এম শাহাদাত/নুরে আলম/গোলাম রাব্বি ॥

বরিশাল নগরীতে ফার্মের সাদা ডিমে রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে রং করে দেশি মুরগির ডিম বলে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। নগরীর সদর রোডে ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিপরীতে ফুটপাতের বিক্রেতার কাছ থেকে ডিম কিনে লেবু দিয়ে ঘষতেই উঠে আসে ডিমের ওপরের রং। পরে নগরীর নাজিরের পুল এলাকার একটি ডিমের আড়তে গিয়েও একইভাবে ডিমের রং উঠে যাওয়ার ঘটনা দেখতে পায় আজকের তালাশের অনুসন্ধানী দল।
অনুসন্ধানে আড়তসংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি দাবি করেন, প্রতিদিন স্বরূপকাঠি থেকে প্রায় তিন হাজার সাদা বয়লার মুরগির ডিম কিনে এনে পটাশ দিয়ে রং করা হয়। পরে সেগুলো দেশি মুরগির ডিমের মতো রং করে প্রতি পিস ১৩ টাকায় বিক্রি করা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সাদা ডিম কেনা হয় ১১ টাকা দরে। এতে প্রতি ডিমে দুই টাকা বেশি পাওয়া যায়।
আজকের তালাশের অনুসন্ধানী দলের কাছে অভিযোগ আসে, বরিশাল নগরীতে ফার্মের মুরগির ডিমের গায়ে রং করে দেশি মুরগির ডিম হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে অনুসন্ধানী দল নগরীর সদর রোডে ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিপরীতে ফুটপাতের একটি ডিমের দোকানে যায়।
সেখানে ছদ্মবেশে ডিম কেনার পর সেটিকে দেশি মুরগির ডিমের মতো হলদে রঙের দেখা যায়। সঙ্গে নিয়ে যাওয়া লেবু দিয়ে ডিমের খোসা ঘষতেই ধীরে ধীরে রং উঠে সাদা খোসা বেরিয়ে আসে। ঘটনাটি দেখে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে বিস্ময় তৈরি হয়। তাঁরা বলেন, ডিমের প্রকৃত রং বদলে এভাবে বিক্রি করা প্রতারনা।
বিষয়টি জানতে চাইলে ফুটপাতের ওই ডিম বিক্রেতা সজল বলেন, তিনি প্রায় দুই বছর ধরে সেখানে ডিম বিক্রি করছেন। কিন্তু এভাবে ডিমের রং উঠে যাওয়ার ঘটনা আগে তাঁর চোখে পড়েনি। তিনি দাবি করেন, নগরীর নাজিরের পুল এলাকার ফেরদৌস নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি ডিম কেনেন। ডিমের রং পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলেও দাবি করেন। পরে তিনি অনুসন্ধানী দলকে ওই আড়তে নিয়ে যেতে রাজি হন।
ডিম বিক্রেতার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানী দল নগরীর নাজিরের পুল এলাকার ফেরদৌসের ডিমের আড়তে যায়। প্রথমে আড়তটি বন্ধ পাওয়া গেলেও কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর এক ব্যক্তি এসে সেটি খোলেন। অনুসন্ধানী দলের সঙ্গে থাকা ফুটপাতের বিক্রেতাও তাঁর সঙ্গে আড়তে প্রবেশ করেন।
আড়তের ভেতরে একই ধরনের রঙিন ডিম পরীক্ষা করে লেবু দিয়ে ঘষার পর সেখানেও খোসার ওপরের রং উঠে যেতে দেখা যায়। এরপর ডিমে রং করার বিষয়ে জানতে চাইলে আড়ত খুলতে আসা ব্যক্তি নিজেকে আড়তের মালিক ফেরদৌসের ছেলে বলে পরিচয় দেন।
তাঁর দাবি, প্রতিদিন স্বরূপকাঠি থেকে প্রায় তিন হাজার সাদা বয়লার মুরগির ডিম প্রতি পিস ১১ টাকা দরে কেনা হয়। এরপর আড়তে বসেই পটাশ দিয়ে ডিমের খোসায় দেশি মুরগির ডিমের মতো হলদে রং করা হয়। পরে সেগুলো প্রতি পিস ১৩ টাকা দরে বিক্রি করা হয়।
তিনি আরও দাবি করেন, গত তিন থেকে চার মাস ধরে কিছুটা বেশি লাভের আশায় তাঁরা এভাবে ডিমে রং করছেন। সব ক্রেতা বা ব্যবসায়ীর কাছে ডিম বিক্রি না করে ফুটপাতে ডিম বিক্রি করা গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর কাছে সরবরাহ করা হয় বলেও জানান তিনি।
তবে ডিমে ব্যবহৃত পদার্থটি ঠিক কী ধরনের পটাশ, তার বিশুদ্ধতা ও রাসায়নিক গঠন কী এবং সেটি খাদ্যদ্রব্যের সংস্পর্শে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরীক্ষাগারভিত্তিক পরীক্ষা প্রয়োজন।
আড়তের মালিক ফেরদৌসের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তাঁর ছেলে জানান, তাঁর বাবা অসুস্থ থাকায় এখন আসতে পারবেন না। ফলে আড়তের মালিকের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি জানান, প্লাস্টিকের ডিমের কথা তাঁরা আগে শুনেছেন। কিন্তু আসল ডিমের খোসায় রং করে দেশি ডিম হিসেবে বিক্রির এমন ঘটনা আগে দেখেননি। নিজেদের চোখের সামনে ডিমের রং উঠে যেতে দেখে তাঁরা বিস্মিত হন।
তাঁদের মতে, ক্রেতারা দেশি মুরগির ডিম মনে করে বেশি দাম দিয়ে ডিম কিনলে তা তাঁদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। এ ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
দেশি মুরগির ডিম ও ফার্মের ডিমের মধ্যে দামের পার্থক্য দ্বিগুন থাকায় ক্রেতারা অনেক সময় রং ও বাহ্যিক চেহারা দেখে ডিম কেনেন। এ সুযোগে ডিমের খোসার রং পরিবর্তন করে বিক্রি করা হলে সাধারণ ক্রেতার পক্ষে প্রকৃত উৎস শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বরিশাল জেলার সহকারী পরিচালক সুৃমি রানী মিত্র বলেন- পরশু দিন সময় পাবো। আমাকে তথ্য দিয়ে রাখুন। আমরা বিষয়টি দেখবো।
খাদ্যপণ্যের বাহ্যিক চেহারা বদলে ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগটি শুধু বেশি লাভের প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে ভোক্তার অধিকার, খাদ্যনিরাপত্তা এবং বাজারে পণ্যের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করার বিষয়ও জড়িত।





